হরমুজ প্রণালি: সংঘর্ষের ছায়ায় বিশ্ব

১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ , ১৪ এপ্রিল ২০২৬
হরমুজ প্রণালি: সংঘর্ষের ছায়ায় বিশ্ব

ডেস্ক রিপোর্ট— মাহাথীর খান ফারুকী:
পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত Strait of Hormuz আজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জলপথগুলোর একটি। প্রতিদিন এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণালিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য “অপরিহার্য পথ” হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
“যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি অবরোধকে কোনোভাবেই সহ্য করবে না।”— মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতি
এই বক্তব্যে বোঝা যায়, United States হরমুজে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত। বিশেষ করে Donald Trump প্রশাসনের সময় ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে এই উত্তেজনা আরও তীব্র হয়।
অন্যদিকে, Iran এই প্রণালিকে তাদের কৌশলগত শক্তির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখে। ইরানের সরকারি অবস্থান স্পষ্ট ও দৃঢ়। তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে বলা হয়েছে:
“যদি ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করা হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো তেলই যেতে দেওয়া হবে না।”— ইরান সরকার
এই হুমকি শুধু রাজনৈতিক নয়—এটি একটি বাস্তব কৌশলগত বার্তা। কারণ ভৌগোলিকভাবে ইরান হরমুজ প্রণালির উত্তর উপকূলে অবস্থান করে, যা তাদের সামরিকভাবে বড় সুবিধা দেয়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) আরও জোর দিয়ে বলেছে:“হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের।”

এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি করে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে ইরান নিজেকে এই অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ভৌগোলিক বাস্তবতাও এই উত্তেজনাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। Strait of Hormuz এতটাই সরু যে বড় জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করতে হয়। ফলে সামান্য ভুল বা ভুল বোঝাবুঝিও দ্রুত বড় সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, এই ধরনের সংকীর্ণ জলপথকে “চোকপয়েন্ট” বলা হয়, যেখানে নিয়ন্ত্রণ মানেই কৌশলগত আধিপত্য ।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো “ভুল হিসাব”। একটি সতর্কতামূলক গুলি, একটি ড্রোনের অনুপ্রবেশ, অথবা ভুল সংকেত—এসবই পূর্ণাঙ্গ সংঘর্ষের সূচনা করতে পারে।
এছাড়া, এই উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইতিহাস বলছে, হরমুজে উত্তেজনা বাড়লেই তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এখনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি শান্ত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। European Commission-এর প্রেসিডেন্ট Leyen বলেছেন:“হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল পুনঃস্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, হরমুজ সংকট এখন শুধু আঞ্চলিক নয়—এটি একটি বৈশ্বিক ইস্যু।
সবশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি আজ শুধু একটি জলপথ নয়; এটি শক্তি, নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘর্ষের প্রতীক। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সংবেদনশীল।কারণ বাস্তবতা হলো—একটি ছোট ভুলই বিশ্বকে বড় সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর