• সম্পাদকীয়
  • আ’ইন-শৃ’ঙ্খলা—বিএনপি সরকারের চ্যালেঞ্জ ও ইউনুস যুগের তুলনা

আ’ইন-শৃ’ঙ্খলা—বিএনপি সরকারের চ্যালেঞ্জ ও ইউনুস যুগের তুলনা

৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ , ১৩ এপ্রিল ২০২৬
আ'ইন-শৃ'ঙ্খলা—বিএনপি সরকারের চ্যালেঞ্জ ও ইউনুস যুগের তুলনা

সীমান্ত টিভি নিউজ ডেস্ক: ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে। বিশেষ করে অপরাধ প্রবণতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা—এই তিনটি সূচকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি জটিল চিত্র সামনে আসে।
সরকারি ও বেসরকারি সূত্রের ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা প্রায় ১০–১২% বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ছিনতাই ও ডাকাতির মতো সম্পদভিত্তিক অপরাধে সামান্য হ্রাস (প্রায় ৫%) লক্ষ্য করা গেলেও সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতি স্থিতিশীল বলা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রভাব এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ২০২৬ সালের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে অন্তত ৭০টির বেশি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যেখানে নিহত হয় প্রায় ২০ জন এবং আহত হয় এক হাজারেরও বেশি। এই সহিংসতা শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনাও বেড়ে যায়।
একটি কেস স্টাডি হিসেবে ২০২৬ সালের শেষভাগে নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের সহিংস শ্রমিক-রাজনৈতিক সংঘর্ষ উল্লেখযোগ্য। মজুরি ও শ্রমিক অধিকার ইস্যুতে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, অন্তত ৪ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়। ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি দেখায় কীভাবে অর্থনৈতিক অসন্তোষ রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
এখন যদি ১৮ মাসব্যাপী ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ইউনুস সরকারের সময় বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষ তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। সে সময় অপরাধের হার পুরোপুরি কমে না এলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল—বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছিল।
তবে ইউনুস সরকারের সীমাবদ্ধতাও ছিল। দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের সময় ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেট না থাকায় অনেক উদ্যোগ আংশিক পর্যায়ে রয়ে যায়। ফলে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই অসমাপ্ত প্রক্রিয়াগুলোর প্রভাবও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পড়ে।
সার্বিকভাবে, ২০২৬-পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের অধীনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির ইঙ্গিত থাকলেও গুরুতর অপরাধ ও রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির প্রবণতা উদ্বেগজনক। অন্যদিকে ড. ইউনুসের ১৮ মাসের শাসনামল স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা এনে দিলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
অতএব, টেকসই আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সহনশীলতা, পেশাদার পুলিশিং, এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।